রবিবার
২২শে সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং
৭ই আশ্বিন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
২৩শে মুহাররম, ১৪৪১ হিজরী

বীমা খাতে অনিয়মই নিয়ম

প্রতিবেদক:  Shomoy News 24    প্রকাশের সময়: 29/08/2015  12:22 AM

অর্থনীতিfile ডেস্ক, সময় নিউজ ২৪ ডটনেট: সঠিক তদারকির অভাবে দেশের বীমা খাতে অনিয়মই নিয়মে পরিণত হয়েছে। গ্রাহকের সঙ্গে প্রতারণা, অবৈধভাবে অর্থ খরচ, চেক জালিয়াতি, ভুয়া এজেন্ট, বিভিন্ন পদে অযোগ্য ব্যক্তি, অতিরিক্ত কমিশন, বাকি ব্যবসাসহ নানা ধরনের দুর্নীতি আর অনিয়ম হরহামেশাই চলছে বীমা খাতে। ব্যাংকিং খাতে কড়া নজরদারির কারণে বীমা খাতকে অনেকেই বেছে নিয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা অভিমত প্রকাশ করেছেন। বীমা নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) মতে, সমস্যা পুরনো। তবে তা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে সংস্থাটি। আর এসব নানা ধরনের দুর্নীতি আর অনিয়ম উঠে এসেছে সংস্থাটির একাধিক তদন্তে প্রতিবেদনে। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের ভাষায় বীমা খাত ফাঁকিবাজিতে খুবই দক্ষ। এ খাতটি আর্থিক খাতের মধ্যে সব থেকে দুর্নীতি গ্রস্ত বলেও মনে করেন তিনি। অতি সমপ্রতি অর্থমন্ত্রী মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের বলেছেন, বীমা খাত নিয়ে আগে কোন কাজ হয়নি। আর্থিক খাতের মধ্যে সব চেয়ে দুর্বল ছিল বীমা খাত। এ খাতে ভয়ঙ্কর দুর্নীতি ও অনিয়ম হয়। এ খাতের দেখভালের জন্য নতুন নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ গঠন করা হয়েছে। বীমা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যাপক অনিয়ম আর দুর্নীতির কারণে বীমা খাতের সাবেক নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা অধিদপ্তর বিলুপ্ত করে ২০১১ সালে গঠন করা হয় নতুন নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ। কিন্তু দুর্নীতি ও অনিয়মের মাত্রা হ্রাস করতে পারেনি সংস্থাটি। 
জানা গেছে, বর্তমানে বীমা কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে আইন বহির্ভূত কমিশন বাণিজ্য, বাকিতে ব্যবসা, প্রিমিয়াম সংগ্রহের চুক্তিনামার ভুয়া কাগজ তৈরি করার অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ পদে অযোগ্য লোক নিয়োগ, শীর্ষ ব্যক্তিদের শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ জালিয়াতির ঘটনা ঘটছে। তাছাড়া কোম্পানির সম্পদ ক্রয়ের সময় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ করছে পুকুরচুরি। বিশেষ করে জমি ক্রয়ের সময় দ্বিগুণ তিনগুণ মূল্য দেখানো হচ্ছে। একই ঘটনা ঘটছে অন্য সব পণ্য ও সম্পদ ক্রয়ের ক্ষেত্রে। ব্যবহারের ক্ষেত্রেও ঘটছে নানা অনিয়ম। একই ব্যক্তি একাধিক গাড়ি ব্যবহার করছেন। কোম্পানির গাড়ি পারিবারিক কাজে এমনকি রেন্টএ কার-এ ভাড়া খাটানোর অভিযোগও রয়েছে। বীমা কোম্পানি থেকে প্রাপ্ত অতিরিক্ত সুযোগ-সুবিধা হাতিয়ে নিচ্ছেন কর্তা ব্যক্তিরা। 
আইডিআরএ’র তথ্যে দেখা যায়, বীমা কোম্পানিগুলো ব্যবসায়িক স্বার্থে নানা অফারের ফাঁদে গ্রাহক সংগ্রহ করাই তাদের মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পদ্ধতি মোতাবেক প্রিমিয়ামের প্রস্তাবিত টাকা ফেরত দেয়ার সময় করা হচ্ছে নানা ছলচাতুরি। বীমার মেয়াদ শেষ হলেও এক থেকে দুই বছর দেরিতে অর্থ পরিশোধ করা হচ্ছে। কখনো সময় আরও বেশি লাগানো হচ্ছে। আর টাকা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে নানা দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে গ্রাহকদের। এসব কর্মকর্তাদের উৎকোচ প্রদানের নজিরের সঙ্গে রয়েছে প্রস্তাবিত অংকের চেয়ে কম টাকা প্রদানের অভিযোগ। তাছাড়া গ্রাহকের পাওনা না দেয়া এবং একজনের পিআর (বীমা পলিসির টাকা জমা দেয়ার রশিদ) নম্বর দিয়ে অন্যজনের পলিসিতে জমা করার অভিযোগ রয়েছে। 
সূত্র জানায়, কমিশন প্রদানের ক্ষেত্রে বীমা কর্তৃপক্ষ যে শর্তারোপ করেছে তাতে কোম্পানিগুলোকে শুধু সনদপ্রাপ্ত এজেন্টের নামে অ্যাকাউন্টপেয়ি চেকের মাধ্যমে কমিশন পরিশোধ করতে হবে। পলিসি, কভারনোট বা অন্য কোন বীমা দলিলের বিপরীতে কোনভাবেই কমিশন সমন্বয়ের পর প্রিমিয়াম গ্রহণযোগ্য হবে না। তাছাড়া বীমা কোম্পানির প্রতিটি শাখা অফিস, প্রিন্সিপ্যাল অফিস ও হেড অফিসে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির ব্যাংকের মাসিক প্রতিবেদন থাকতে হবে। এক্ষেত্রে ব্যাংকের প্রতিবেদনটি এমনভাবে সংরক্ষণ করতে হবে যাতে সহজেই নিরীক্ষণ বা পরিদর্শন সহজ হয়। এজন্য সব ব্যাংক হিসাবের বিবরণীতে প্রিমিয়াম আয় ও কমিশন ব্যয় সুস্পষ্টভাবে প্রতিটি ক্ষেত্রে চিহ্নিত করতে হবে।
অন্যদিকে বীমা দাবি পূরণের ক্ষেত্রে সীমাহীন অনিয়ম করছে বীমা কোম্পানিগুলো। বিশেষ করে মৃত্যুদাবি ও অগ্নিবীমা দাবি পূরণের ক্ষেত্রে পদে পদে হয়রানির শিকার হচ্ছেন গ্রাহকরা। বীমা কোম্পানিগুলোর শাখা এবং কেন্দ্রীয় অফিসে ধরনা দিয়ে কোন সুফল না পেয়ে ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করছেন আইডিআরএ’তে। 
জানা গেছে, সম্প্রতি আইডিআরএ’তে ১৫টি অভিযোগ উভয় পক্ষের উপস্থিতিতে শুনানি হয়েছে যার সবগুলোতে বীমা কোম্পানিগুলো দোষী সাব্যস্ত হয়েছে। গ্রাহকের টাকা চুষে নিতে সার্ভেয়ার নিয়োগেও দুর্নীতি করছে বীমা কোম্পানিগুলো। প্রতিবেদনে টাকা কম দেখাতে সার্ভেয়ার কোম্পানিগুলোকে ম্যানেজ করতে ব্যস্ত তারা। সমপ্রতি এ ধরনের একটি সার্ভেয়ার কোম্পানিকেও জরিমানা করেছে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা।  
আইডিআরএ সূত্র জানায়, মোট ৭৮টি বীমা কোম্পানি বর্তমানে আইডিআরএ’র নিয়ন্ত্রণে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বীমা খাতে বিদ্যমান দুর্নীতি ও অনিয়ম রোধ করে সুশাসন ফিরিয়ে আনতে ৬ বছর পর কোম্পানি ভিত্তিক অডিট কার্যক্রম শুরু করেছে আইডিআরএ। বিভিন্ন অভিযোগের ভিত্তিতে এ উদ্যোগ নেয়া হয়। কিন্তু প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় অনেক বীমা কোম্পানিই রয়ে গেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির নজরদারির বাইরে। ফলে প্রতিনিয়ত বীমা কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আইডিআরএ’র নজরে এলেও তাদের বিরুদ্ধে জোরালো কোন ব্যবস্থা নিতে পারছে না। মাঝেমধ্যে দুয়েকটি কোম্পানিকে নোটিস দিয়েই আইডিআরএ তার দায়িত্ব শেষ করছে। ফলে দিনের পর দিন অনিয়ম ও দুর্নীতি করেও পার পেয়ে যাচ্ছে অনেক বীমা কোম্পানি।
সূত্র জানায়, বীমা কোম্পানির স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে বীমা খাতে প্রতিবছর বিশেষ নিরীক্ষা করার নিয়ম থাকলেও লোকবলের অভাবে বেসরকারি বীমা কোম্পানিগুলোতে তা বন্ধ রয়েছে। এতে করে বিশেষ নিরীক্ষার মাধ্যমে কোম্পানির আয়-ব্যয়, ব্যবস্থাপনাসহ কোম্পানির অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে এসব কোম্পানিতে প্রকৃত অবস্থা কি- তা অনেক ক্ষেত্রে জানা যাচ্ছে না। তবে সমপ্রতি এ ধরনের তদারকি শুরু হয়েছে। প্রায় সব কোম্পানির কম-বেশি অনিয়ম উঠে এসেছে। এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হলে স্বচ্ছতা অনেকাংশে ফিরে আসবে বলে সংশ্লষ্টরা জানান।
আইডিআরএ’র সদস্য সুলতান-উল-আবেদীন মোল্লা বলেন, বীমা খাতের দুর্নীতি অনিয়ম দূর করতে আমরা বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছি। জনবল সঙ্কটের কারণে বিভিন্ন পদক্ষেপ আটকে আছে। তারপরও আমরা যথাসাধ্য তদারকি করছি। গতদিনের সব রেকর্ড আমরা দেখেছি সেগুলোর ওপর ব্যবস্থা নিতেও আমরা কাজ করছি। 
বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের সহ-সভাপতি আহসানুল ইসলাম বলেন, বীমা খাত এখন অনেক ভাল অবস্থানে রয়েছে। তবে এ খাতে অনেক পুরাতন আইন আছে যেগুলো হয়তো প্রতিপালন করা যায়নি। তিনি বলেন, প্রতি সেক্টরে দুই-একজন খারাপ থাকেই। ঢালাওভাবে সকলকে খারাপ বলা ঠিক না। তিনি বলেন, আইন যত কড়া হবে বীমা খাতের জন্য ততো ভাল হবে। 

সূত্র: মানবজমিন।

Site Develop by : Shekh Mostafizur Rahman Faysal