মঙ্গলবার
১৯শে নভেম্বর, ২০১৯ ইং
৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
২১শে রবিউল-আউয়াল, ১৪৪১ হিজরী

অপরুপ স্থাপত্যকলা ‘উত্তরা গণভবন’

প্রতিবেদক:  Shomoy News 24    প্রকাশের সময়: 09/09/2018  10:56 PM
অমর ডি কস্তা, সময় নিউজ ২৪ ডটনেট, নাটোর: নাটোরের উত্তরা গণভবন প্রাচীন স্থাপত্যকলার এক অপরুপ নিদর্শন।  নাটোর শহর থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত  উত্তরা গণভবনটি প্রায় ৩শ’ বছরের প্রাচীন ইতিহাস-ঐতিহ্যের সৌন্দর্যের সাক্ষ্য বহন করে এখনও  যেনো তেমনিই রূপ ছড়িয়ে চলেছে।
কালের স্বাক্ষী উত্তরা গণভবন দেশব্যাপী একনামে পরিচিত।  ভবনটির  সামনে আসলে সবাইকেই থমকে যেতে হয়। দৃষ্টিনন্দন সুদৃশ্য বিশাল সিংহদুয়ার। এর উপরে বিশাল এক ঘড়ি-যা ঘন্টা ধ্বনী বাজিয়ে আজও সঠিক সময় জানান দিয়ে যাচ্ছে। চারিদিকে সুউচ্চ প্রাচীর ও পরিখার বেষ্টনী,  দেশী-বিদেশী দুস্প্রাপ্য অনেক বৃক্ষরাজি, ইটালিয়ান গার্ডেনের শ্বেত পাথরের ভাস্কর্য শোভিত দৃষ্টিনন্দন বিশাল এ রাজপ্রাসাদ। দৃষ্টি নন্দন প্রবেশদ্বার ছাড়াও এখানে রয়েছে মোট ১২টি ভবন। এগুলো হচ্ছে প্রধান প্রাসাদ ভবন, কুমার প্যালেস, প্রধান কাচারীভবন, ৩টি কর্তারাণী বাড়ি, রান্নাঘর, মটর গ্যারেজ, ড্রাইভার কোয়ার্টার, ট্রেজারি বিল্ডিং ও সেন্ট্রি বক্স। প্যালেসের দক্ষিণে রয়েছে ফুলের বাগান। এ বাগানটি ইটালিয়ান গার্ডেন নামে পরিচিত। দেশী-বিদেশী নানা জাতের ফুলে পরিপূর্ন এ বাগান। বাগানের ভিতর শ্বেত পাথরের আকর্ষনীয় ৪টি নারীর ভাস্কর্য সবাইকে মুগ্ধ করে। রয়েছে একটি ইটালিয়ান টাইপের ফোয়ারা এবং মাঝে মাঝে লৌহ ও কাঠ দ্বারা নির্মিত বেঞ্চ, একটি ডিম্বাকার সাইজের মার্বেল পাথরের নির্মিত আসনসহ মঞ্চ।  সমগ্র বাগানে অসংখ্য ফুলের সমাহার। আছে নাগালিঙ্গম, কর্পুর,এগপ্লান্ট, হৈমন্তীর মত দুস্প্রাপ্র সব বৃক্ষরাজি আর কৃত্রিম ঝর্ণা। দিঘাপতিয়া রাজবাড়ির মূল প্রাসাদটি একতলা। এর মাঝে রয়েছে প্রশস্ত একটি হলরুম। বেশ উঁচু হলরুমের শীর্ষে রয়েছে বিশাল এক গুম্বুজ। এ গুম্বুজের নিচ দিয়ে হলরুমে আলো বাতাস প্রবেশ করে। হলরুমের মাঝে রাজার আমলে তৈরি বেশকিছু সোফা রয়েছে। এছাড়াও হলরুমে একটি কারুকার্য খচিত সোফা রয়েছে যাতে একসঙ্গে চারজন চারমূখী হয়ে বসা যায়-যা বিরল। হলরুমের আসবাবপত্র এখনো রয়েছে। উপরে রয়েছে সেই আমলের ঝাড়বাতি। হলরুমের পাশে রয়েছে আরেকটি বড় ঘর। পাশের রান্নঘর হতে এ ঘরে সরাসরি আসা যায়। নিরাপত্তার জন্য রান্নাঘরের করিডোরের দু’পাশে রাজ আমলের তার দিয়ে এখনো ঘেরা রয়েছে। এর পাশে একটি ঘরে রয়েছে সিংহাসন। এর পাশের ঘরটি ছিল রাজার শয়নঘর। এ ঘরে এখনো রাজার খাট শোভা পাচ্ছে।  কুমার ভবনের পেছনের ভবন রাজার কোষাগার আর অস্ত্রগার। দক্ষিণে ছিল রাণীমহল। আজ আর সেটা নেই। ৬৭ সালে ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে। রাণীমহলের সামনে একটি ফোয়ারা এখনো সেই স্মৃতিবহন করে চলেছে। তারই পাশে ছিল দাসী ভবন। রাজার একটি চিড়িয়াখানাও ছিল। নাটোরের বর্তমান জেলা প্রশাসক শাহিনা খাতুন আবার নতুন করে সেই চিড়িয়াখানা চালু করেছেন। শাহিনা খাতুনের উদ্যোগে রাজার ট্রেজারী ভবনে গড়ে তোলা হয়েছে সংগ্রহশালা।রাজা-রানীর ব্যবহৃত নানা সামগ্রী সংগ্রহ করে দর্শনার্থীদের দেখার জন্যে এই সংগ্রহশালায় রাখা হয়েছে। মূল ভবন রাজ প্রাসাদের সামনে রয়েছে রাজা প্রসন্ন নাথ রায়ের আবক্ষ মূর্তি। এর দু’পাশে রয়েছে দুটি কামান। মূল প্যালেসের মাঠের পূর্বে রয়েছে রাজার দোলমঞ্চ। পাশেই রয়েছে কুমার প্যালেস। এর সামনে বসানো চারচাকা বিশিষ্ট একটি কালো কামান আজো শোভা পাচ্ছে। মূল রাজপ্রাসাদের প্রবেশের পথে সিঁড়ির দু’পাশে ছিল দুটি কালো কৃষ্ণ মূর্তি-যা এখন শোভা বর্ধন করছে সংগ্রহশালার। সংগ্রহশালার প্রবেশ করিডরে রয়েছে ধাতব বর্ম। এটা পরেই নাকি রাজা যুদ্ধে যেতেন। এ কারণে পিতলের তৈরি এ বর্মটি দর্শনার্থীদের আরো বিশেষভাবে নজর কাড়ে। রাজপ্রাসাদের উত্তর পাশে ছিল রাজার বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র। সেখান থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ অস্টাদশ শতকের রাজবাড়ি বিদ্যুতের আলোতে ঝলমল করতো।  পুরো রাজপ্রাসাদে ছিল রাজার বিভিন্ন চিত্রকর্ম, ছবি আর বিদেশী ঘড়ি- আজ সে সব আর নেই। প্রাসাদের শ্বেতপাথরের মেঝে মোড়ানো থাকতো পার্সিয়ান গালিচায়। রাজা প্রমদানাথ রায়ের প্রচন্ড রকম ঘড়িপ্রীতি ছিল। আর এ জন্য তিনি দেশ বিদেশ থেকে অর্ডার দিয়ে ঘড়ি তৈরি করে আনতেন। এসব ঘড়ি মূল প্রাসাদ ভবন ছাড়াও বিভিন্ন ভবনে স্থাপন করতেন। এমন একটি ঘড়ি ছিল যাতে ১৫ মিনিট পরপর জলতরঙ্গ বাজতো। এছাড়া রাজবাড়ির মূল ফটকে রয়েছে একটি ঘড়ি। এর দু’পাশে দুটি ডায়াল। ঘড়িটি এখনো সঠিকভাবেই সময় দিচ্ছে। ঘড়িটি ইটালির ফ্লোরেন্স থেকে আনা হয়েছিল। আগে এর ঘন্টাধ্বনী ১০/১২ মাইল দূর থেকে শোনা যেত-এখন এই ঘন্টাধ্বনী শোনা যায় এক মাইল দূর থেকে। শোনা যায় স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় দিঘাপতিয়া রাজবাড়িতে পাকবাহিনীর ক্যাম্প হওয়ায় কিছু ঘড়িসহ অন্যান্য মূলবান সম্পদ এরা নিয়ে যায়। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর দিঘাপতিয়া রাজা দেশত্যাগ করে ভারতে চলে যান। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালের ৯ ফেব্রুয়ারী এটাকে উত্তরা গণভবন হিসেবে এবং নাটোরকে দ্বিতীয় রাজধানী হিসেবে ঘোষণা দেন । দর্শনাথীদের জন্য খুলে দেয়া হয়েছে এর বেশির ভাগ অংশ। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর উত্তরাঞ্চলীয় এই বাসভবন গত বছরের শেষ দিকে ছিল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। জেলা প্রশাসন ঐতিহাসিক স্থাপনাটির ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালনে আরো সক্রিয় হলে বদলে যেতে শুরু করে এটি। সংস্কার কাজ শুরু করে জেলা প্রশাসন। বাইরের মানুষের কাছে থেকে যাওয়া রাজপরিবারে ব্যবহৃত ঐতিহ্যবাহী ও দূর্লভ স্মৃতিচিহ্ন সংগ্রহ শুরু করা হয়- যা বর্তমানে সংগ্রহশালায় সংরক্ষণ করা হয়েছে। মূল ফটক দিয়ে প্রবেশের পর গণভবনের মূল প্যালেসে যেতে হাতের বাম দিকে রাণীঘাটের দিকে এগুতেই চোখে পড়ে চিড়িয়াখানা। সেখানে রয়েছে হরিণশালা, বানর, ময়ুর, টিয়াপাখি। নতুন স্থাপিত সংগ্রহশালার ব্যাপারে দর্শনার্থীরা ইতিবাচক মনোভাব পোষন করেন বলে তাদের সাথে আলাপচারিতায় জানা যায়। রাজবাড়ীর প্রবেশপথের ডান পাশ দিয়ে এগিয়ে গেলে চোখে পড়ে শত বছরের শতাধিক প্রায় আম গাছ-যেখানে সম্প্রতি স্থাপন করা হয়েছে পাখি অভয়াশ্রম। উত্তরা গণভবনের দর্শনার্থীদের নিরাপত্তায় ট্যুরিস্ট পুলিশের একটি টিমও এখানে  কাজ করছে। নাটোরের জেলা প্রশাসক শাহিনা খাতুন বলেন, সংস্কারসহ সংগ্রহশালা, চিড়িয়াখানা ও পাখির অভয়াশ্রম গড়ে তোলায় গণভবনে দর্শনার্থীর সংখ্যা আগের তুলনায় বেড়েছে।  ঈদের দিনসহ প্রতিদিন দর্শনার্থীদের জন্য খোলা থাকছে। এখানে প্রবেশের  মূল্য ১০ থেকে ২০ টাকা আর সংগ্রহশালায় প্রবেশমূল্য ৩০ টাকা।
Site Develop by : Shekh Mostafizur Rahman Faysal